৪ খুন, ধর্ষণ ও চুরির ঘটনায় কিশোরের চাঞ্চল্যকর জবানবন্দি

0
148
ছবি: ইন্টারনেট

৪ খুন, ধর্ষণ ও চুরির ঘটনায় কিশোরের চাঞ্চল্যকর জবানবন্দি

গাজীপুর শ্রীপুর উপজেলার আবদার গ্রামের একই পরিবারের চারজনকে গলাকেটে হত্যা মামলার প্রধান আসামি তার জবানবন্দিতে পুলিশের কাছে রোমহস্যক তথ্য দিয়েছে। বয়সের কথা বিবেচনা করে তাকে টঙ্গির কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্রে রাখা হয়েছে।

চাঞ্চল্যকর চার হত্যা মামলার প্রধান আসামি ১৭ বছরের ওই কিশোর মুঠোফোন চুরির উদ্দেশ্যে রাতের আঁধারে ওই বাড়িতে ঢুকে। এরপর একে একে বাড়ির চার বাসিন্দাকে কুপিয়ে যখম করে। তারপর রক্তাক্ত অবস্থায় দুই কিশোরী বোনকে ধর্ষণ করে। ধর্ষণের পর গলাকেটে সবার মৃত্যু নিশ্চিত করে। ওই কিশোরের নির্মমতা থেকে আট বছরের প্রতিবন্ধী শিশুটিও রেহাই পায়নি। হত্যার পর সে দুইটি মোবাইল ফোন, তিনটি স্বর্ণের চেইন, আংটি ও কানের দুল নিয়ে বাড়ীর পেছন গেট দিয়ে চলে যায়।

গত ২৩ শে এপ্রিল, বৃহস্পতিবার আবদার গ্রামের একটি ফ্লাট বাড়ীর দ্বিতীয় তলায় একই পরিবারের মাসহ চারজনের গলাকাটা লাশ পাওয়া যায়। ওই চারজন হলেন ইন্দোনেশিয়ার নাগরিক ফাতেমা আক্তার (৪০), তাঁর বড় মেয়ে সাবরিনা নূরা (১৬), ছোট মেয়ে মোছা. শাওরিন (১২) ও ছেলে ফাদিল সামদানি (৮)। কিশোরটির বিরুদ্ধে একটি ৭ বছরের শিশুকে ধর্ষণ করে হত্যার অভিযোগও রয়েছে।

ফাতেমার মালয়েশিয়ায় চাকরির সুবাদে বাংলাদেশের রেজোয়ান হোসেনের সাথে পরিচয় ও প্রেম হয়। এরপর ২২ বছর আগে তাঁরা বিয়ে করেন এবং ২০১০ সালে সন্তানদের নিয়ে এই দম্পতি শ্রীপুরের আবদার গ্রামে চলে আসেন। এরপর রেজোয়ান মালয়েশিয়ায় কাজ অব্যাহত রাখলেও ফাতেমা সন্তানদের নিয়ে বাংলাদেশেই থেকে যান।

রেজোয়ান ফাতেমার বড় মেয়ে সাবরিনা এ বছর এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছিল। ছোট মেয়ে শাওরিন পার্শ্ববর্তী ব্রাইট ক্যাডেট মাদ্রাসায় ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্রী এবং ছোট ছেলে সামদানি নার্সারির ছাত্র ছিল।

এ ঘটনার পর পুলিশ এ ঘটনার তদন্ত শুরু করেন এবং গত ২৬ শে এপ্রিল, রবিবার রাতে গাজিপুরের পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেষ্টিগেশন (পিবিআই) ঘটনার প্রধান আসামি কিশোরটিকে গ্রেপ্তার করে। পরে কিশোরের দেয়া তথ্য অনুযায়ী কিশোরের বাড়ী থেকে তার রক্তমাখা গেঞ্জিসহ নিহতদের দুইটি মোবাইল ফোন, তিনটি স্বর্ণের চেইন, আংটি ও কানের দুল উদ্ধার করা হয়। গ্রেপ্তারের পর কিশোরটি গাজীপুরের জ্যেষ্ঠ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মো. শরিফুল ইসলামের কাছে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়।

পিবিআইয়ের প্রধান বনজ কুমার মজুমদার জানান, থানা-পুলিশ ও সিআইডির পাশাপাশি পিবিআই ঘটনাটির ছায়া তদন্ত করছিল। ঘটনার পর থেকে মালয়েশিয়া প্রবাসী রেজোয়ান হোসেনের (ভুক্তভোগীদের বাবা) সাথে নিয়মিত যোগাযোগ করছিলেন। রেজোয়ানের কাছে জানতে পারে ওই কিশোর বিভিন্ন সময়ে তাঁর মেয়েদের উত্ত্যক্ত করত। এ ঘটনায় তিনি ওই কিশোরকে সন্দেহ করেন। তাঁর সন্দেহের ভিত্তিতে ওই কিশোরকে গ্রেপ্তার করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।

গ্রেপ্তারকৃত কিশোরটি স্থানীয় একটি মক্তবের ছাত্র। তার বাবা রিকশাচালক। দুই ভাই ও এক বোনের মধ্যে সে দ্বিতীয়।

পিবিআই জানায়, ওই কিশোরের বিরুদ্ধে ২০১৮ সালে সাত বছরের একটি শিশুকে ধর্ষণ করে হত্যার অভিযোগ রয়েছে। এ ঘটনায় শ্রীপুর থানায় মামলা হওয়ার পর তার বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে। ৯ মাস জেলে থাকার পর সে কিছুদিন আগে জামিনে ছাড়া পেয়েছে।

পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে অভিযুক্ত কিশোরটি পুরো ঘটনার বর্ণনা দেয়। সে বৃহস্পতিবার রাত ১২ টা ৪০ মিনিটে ওই বাড়িতে যায়। বাড়ির দেয়ালের বের হয়ে থাকা ইটে পাড়া দিয়ে দোতলার ছাদে ওঠে। এরপর ব্লেড দিয়ে ছাদে কাপড় শুকানোর রশি কেটে, রশিটি ছাদের গ্রিলের সাথে বেঁধে রশি বেয়ে দোতলার বাথরুমের ভেন্টিলেটরের ফাঁকা দিয়ে ভেতরে ঢোকে। এরপর বাথরুমে রাখা ওয়াশিং মেশিনে পা রেখে নিচে নামে। বাথরুম থেকে বের হয়ে নূরা ও শাওরিনের রুমে যায়। নূরা তখনো জেগে ছিল দেখে অভিযুক্ত কিশোর তাদের বিছানার নিচে লুকিয়ে থাকে এবং প্রায় এক ঘণ্টাপর সবাই ঘুমিয়ে পড়লে, সে বিছানার নিচ থেকে বেরিয়ে আসে।

এরপর সে নিচতলায় গিয়ে রান্নাঘর থেকে একটি বঁটি নিয়ে এসে ফাতেমা আক্তারের ঘরে ঢোকার জন্য দরজা খোলে। দরজায় শব্দ পেয়ে ফাতেমা আক্তার জেগে ঘর থেকে বেরিয়ে এসে এদিক–সেদিক তাকান। তিনি কাউকে নে পেয়ে আবার ঘরে ঢুকতে গেলে লুকিয়ে থাকা কিশোরটি তাকে বঁটি দিয়ে মাথা ও ঘাড়ে আঘাত করে। তখন ফাতেমা অজ্ঞান হয়ে মাটিতে পড়ে যান। শব্দ পেয়ে নূরা ঘুম থেকে উঠে এলে কিশোরটি তাকেও এলোপাতাড়ি কোপায়। এরপর নূরার আট বছরের প্রতিবন্ধী ভাই ফাদিল জেগে ওঠে ঘরের এদিক–সেদিক দৌড়াদৌড়ি করতে থাকে। এরপর কিশোরটি তাকেও বটি দিয়ে কুপায়। তখন শাওরিনের ঘুম ভেঙে গেলে সে চিৎকার করে। তখন কিশোরটি তাকেও বঁটি দিয়ে কুপিয়ে ফেলে রাখে। এরপর রক্তাক্ত অবস্থায় দুই বোনকে ধর্ষণ করে।

ধর্ষণের পর সবার মৃত্যু নিশ্চিত করতে ছুরি দিয়ে সবার গলা কেটে হত্যা করে। এরপর ফাতেমা আক্তারের গলার স্বর্ণের চেইন, দুইটি কানের দুল, একটি কানফুল, একটি নাকফুল এবং দুই মেয়ের আলমারি থেকে দুইটি স্বর্ণের চেইন, একটি আংটি, একটি লাল রঙের ডায়েরি ও ফাতেমার ঘর থেকে দুইটি মুঠোফোন নিয়ে বাড়ির পেছন গেট খুলে নিজের বাড়িতে চলে যায়।

গাজীপুর পিবিআইয়ের পরিদর্শক হাফিজুর রহমান বলেন, কিশোরটি যখন সবাইকে কুপিয়েছে, তখন নিহতদের দুইজন চিৎকার করেছিলেন। কিন্তু আশপাশের কেউ তা শুনতে পায়নি। সে বাড়িটিতে পাঁচ ঘণ্টা অবস্থান করে। সে যখন বাড়ী থেকে বেড় হয় তখন ফজরের আযান হচ্ছিল। গ্রেপ্তারের পর তার দেওয়া তথ্যমতে তার বাড়ির আলনার অন্যান্য কাপড়ের মধ্যে থেকে তার রক্তমাখা গেঞ্জি উদ্ধার করা হয়েছে। এ ছাড়া দুইটি মোবাইল ফোন, তিনটি স্বর্ণের চেইন, আংটি ও কানের দুল উদ্ধার করা হয়।

হাফিজুর রহমান বলেন, ছেলেটির বয়স নির্ধারণের জন্য পরীক্ষা করা হবে। প্রাথমিকভাবে সে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেওয়ার পর তাকে টঙ্গীর কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্রে পাঠানো হয়েছে।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে