“লি কুয়ান ইউ” আধুনিক সিঙ্গাপুরের রুপকার।

0
442

মরতুজা মিশু (ব্যাংকার, কলামিস্ট):

OURBANGLANEWS DESK।

“লি কুয়ান ইউ” আধুনিক সিঙ্গাপুরের রুপকার।

লি কুয়ান ইউ এর জীবনী
কুয়ান ইউ’ অর্থ ‘উজ্জ্বল আলো’। নেতা লি কুয়ান ইউকে সিঙ্গাপুরী জাতির ইতিহাসে ‘উজ্জ্বল আলো’ মানা হতো।লি কুয়ান ইউ, (জন্ম: ১৬ সেপ্টেম্বর, ১৯২৩ – মৃত্যু: ২৩ মার্চ, ২০১৫) স্ট্রেইট সেটেলম্যান্টসে (ব্রিটিশ আমলের সিঙ্গাপুর) জন্মগ্রহণকারী সিঙ্গাপুরের বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ ছিলেন।

সিঙ্গাপুরের প্রথম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মালয়েশিয়ার কাছ থেকে দেশ স্বাধীনতার পর ১৯৬৫ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত দেশ পরিচালনা করেন। হক্কা ও চীনা পেরানাকান বংশোদ্ভূত চতুর্থ প্রজন্মের সিঙ্গাপুরী তিনি। ১৯৩১ সালে তেলক কুরাউ ইংলিশ স্কুলে প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ করেন।

১৯৩৫ সালে র‌্যাফল ইনস্টিটিউশনে ভর্তি হন। কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ফিৎজউইলিয়াম কলেজ থেকে আইনে প্রথম শ্রেণীতে দ্বৈত তারকা প্রাপ্ত হন ও ডিগ্রী লাভ করেন। ১৯৫০ সালে মিডল টেম্পলে ব্যারিস্টার মনোনীত হন ও ১৯৫৯ পর্যন্ত আইনজীবী ছিলেন।

১৯৫৪ সালে পিপলস অ্যাকশন পার্টির (পিএপি) সহঃ প্রতিষ্ঠাতা হন ও ১৯৯২ সাল পর্যন্ত দলের মহাসচিব ছিলেন। তিন দশকেরও অধিক সময় রাষ্ট্রপরিচালনার সাথে নিজেকে সম্পৃক্ত রাখেন। তাঁকে ‘সিঙ্গাপুরের স্বাধীনতার জনক’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়।

সিঙ্গাপুরের উৎথান কখন কিভাবে?
সিঙ্গাপুর নামটি এসেছে মালেশিয়ান শব্দ ‘সিঙ্গাপুরা’ (singapura) থেকে। যেখানে Singa শব্দটি এসেছে সংস্কৃত শব্দ ‘সিমহা'(simha) থেকে যার অর্থ সিংহ এবং ‘পুরা'(pura) শব্দটির অর্থ সিটি বা শহর।[২] সুতরাং সিঙ্গাপুর শব্দের অর্থ সিংহের শহর।

সিঙ্গাপুর দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার একটি দ্বীপরাষ্ট্র। দেশটি মালয় উপদ্বীপের নিকটে অবস্থিত। এর আনুষ্ঠানিক নাম সিঙ্গাপুর প্রজাতন্ত্র। স্বাধীনতা শুনতে অনেকটা স্বস্তিদ্বায়ক হলেও এর জন্য অনেকটা লড়াকু হতে হয় একটা জাতীকে। সিঙ্গাপুর তার উর্ধ্বে নয়। স্বাধীনতার জন্য, লড়াই করা, প্রান দেওয়া এ যেন এক চিরাচরিত নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে।

১৯৫৯ সালে ব্রিটিশ উপনিবেশ থেকে মুক্তি লাভ করে দেশটি। এরপর তারা মালেশিয়া ফেডারেশনে যোগদেয় এক বুক আশা নিয়ে। কিন্তু মালেশিয়া তাদের কে ১৯৬৫ সালে বের করে দেয় মালেশিয়া ফেডারেশন থেকে। সেদিন নিজের কান্না ধরে রাখতে পারেন নি তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী লি কুয়ান ইউ। আর সেদিন বের করে দেওয়ার লজ্জাবোধ ও জিদ থেকেই হয়তো আজকের আধুনিক সিঙ্গাপুরের প্রেরনা তৈরি হয়েছিল।

তখন সিঙ্গাপুরে কোন প্রাকৃতিক সম্পদ ছিলনা। অনেকেই ধারনা করেছিল হয়তো সিঙ্গাপুর টিকতে পারবে না। অথচ সিঙ্গাপুর সবার ধারণা কে পাল্টে দিয়ে বর্তমানে পৃথিবীর অন্যতম ধনী রাষ্ট্র যার রুপকার লি কুয়ান ইউ। ৭১৯ বর্গকিলোমিটারের সিঙ্গাপুরে ১৯৬০ সালে জনসংখ্যা ছিল ২০ লাখের নিচে যা বর্তমানে প্রায় ৫৬ লাখ।

সবচেয়ে মজার বিষয় ছিল, তৎকালীন সিঙ্গাপুর ছিল বস্তীবাসীর দিক থেকে প্রথম স্থানে। জিডিপি ছিলো ১ বিলিয়ন ডলার যা বর্তমানে ৪৪৭.৩ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। ১৯৬০ সালে মাথাপিছু আয় ছিল ৪২৭ ডলার কিন্তু বর্তমানে ৭৬৮৬৩ ডলার যা ফ্রান্স, জাপান কিংবা জার্মানির চেয়ে বেশি। দুর্নিতিতে জর্জরিত সিঙ্গাপুর অাজ সবচেয়ে কম দুর্নীতিগ্রস্ত তালিকায় সপ্তম অবস্থানে। সবকিছুই সম্ভব হয়েছিল লি কুয়ান ইউ এর দূরদর্শী নেততৃত্বের ফলে। জনগন তার নেতৃত্বে আস্থা রেখেছিল যার ফলশ্রুতিতে আজকের সিঙ্গাপুর।

১৯৬৫ এর জর্জরিত সিঙ্গাপুর ২১ শতকে ধনী হওয়ার মূলমন্ত্র কি ছিল?
লির চোখে উচ্চাকাঙ্ক্ষার কমতি ছিলো না। স্বাধীনতার শুরুতেই তাই হাত দিলেন পরিকল্পিত নগরায়ন আর উন্নত অবকাঠামো বিনির্মাণে। ‘হাউজিং এন্ড ডেভেলপমেন্ট বোর্ড’ গঠন করে লি কুয়ান ইউ সর্বপ্রথম সিঙ্গাপুরবাসী প্রত্যেকের জন্য সরকারি আবাসন নিশ্চিত করেন। চীন, মালয় ও ভারতীয়দের সংমিশ্রণে তৈরি সিঙ্গাপুরে জাতীয় ঐক্য আনয়নে বা বৈষম্য দূরীকরনে এটা ছিলো তার যুগান্তকারী পদক্ষেপ।

যেহেতু আয়তন কম ছিলো তাই উন্নয়নউন্নয়নের হাতিয়ার হিসেবে কুয়ান বীনিয়োগকারীদের আকৃষ্টকরতে কাজ শুরু করেন প্রথমে বিনিয়োগযোগ্য সবুজায়নে হাত দেন। “গার্ডেন সিটি এ্যাকশন কমিটি” প্রতিষ্ঠা করে তিনি ঢেলে সাজান পুরো শহর। বড় বড় অট্টালিকার পাশাপাশু খেলাট মাঠ, বাগান, পার্ক নির্মান করে পুরো শহর কে পরিচ্ছন্ন শহরে রুপান্তর করেন। সিঙ্গাপুর এতোটাই পরিচ্ছন্ন শহর যে সকাল বিকাল ২ বার রাস্তা দোয়া হয় এমনকি এখানে সিঙ্গাম খাওয়া নিষেদ।

এছাড়া গনপরিবহন, রেলসংযোগ, নৌ সংযোগ এ গুরুত্ব দেন। মোট কথা পুরো দেশটাই নতুন আঙ্গিকে ঢেলে সাজান। তৃতীয় বিশ্বের একটি দেশ হিসেবে এত টাকা সিঙ্গাপুর তখন কোথায় পেলো, যা দিয়ে এমন অভূতপূর্ব অবকাঠামো উন্নয়ন সম্ভব? উত্তরটা নিহিত ১৯৭৩ এর এক ঘটনায়। সে বছর আমেরিকা যখন ডলারের সাথে স্বর্ণমজুদ ব্যবস্থার সম্পর্কচ্ছেদ করে, তখন তার চূড়ান্ত ফায়দা নেন লি কুয়ান ইউ। বিশ্বব্যাপী মুদ্রা বিনিময় বাজারের শীর্ষস্থান হিসেবে উঠে আসে সিঙ্গাপুর। এশিয়ায় ডলারের বাজার তৈরিতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বী হংকংকে ছাড়িয়ে যায় সিঙ্গাপুর। সেই সঙ্গে মার্কিনঘেঁষা নীতি ও মুক্তবাজার অর্থনীতির প্রতি অনুরাগের জন্য মাথার ওপর ছিলো বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ-এর আশীর্বাদ।

মন্ত্রী-আমলা ও সরকারি চাকুরেদের বিশাল অঙ্কের বেতন প্রদান করা শুরু করেন লি, যাতে তারা ঘুষও না খান, আন্তরিকতা নিয়ে দায়িত্বও পালন করেন; এবং সর্বোপরি সরকারের ওপর সদা তুষ্ট থাকেন।

যখন ক্ষমতায় এলেন, সিঙ্গাপুর ছিলো কেবল ঝিমিয়ে থাকা এক সমুদ্র বন্দর। তবে ভৌগোলিক অবস্থানটি অর্থনৈতিক গুরুত্বের দিক থেকে যে বেশ লোভনীয়, তা বুঝেছিলেন লি। তাই উন্নয়নের বড় হাতিয়ার করতে চাইলেন এই দিকটিকে। ঢেলে সাজালেন সিঙ্গাপুরের সমুদ্রবন্দর, বিমানবন্দর ও সংশ্লিষ্ট অবকাঠামোকে। অত্যাধুনিক সুযোগ-সুবিধাপ্রদানসহ পর্যটক-আনুকূল্যে যা যা করা দরকার সব করেছেন। ফলাফলও এলো হাতেনাতে। অল্প সময়েই সিঙ্গাপুর পরিণত হলো এয়ারলাইন্সগুলোর ট্রানজিট হাবে। দূরবর্তী ফ্লাইটের যাত্রীরা এখন ট্রানজিট হিসেবে সিঙ্গাপুরকেই বেছে নেন।

এভাবে বিমানসংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোর সদর দপ্তর বানাতে শুরু করলো সিঙ্গাপুরে। তাই অাজ সাংহাইয়ের পর সিঙ্গাপুরই বিশ্বের ব্যস্ততম সমুদ্রবন্দর।
এভাবে আঞ্চলিক কেন্দ্র হিসেবে শক্ত আবির্ভাবের পর সিঙ্গাপুর পরিণত হয় দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া তথা এশিয়ারই সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক হাবে। কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানসমূহ দলে দলে বেছে নিতে থাকলো সিঙ্গাপুরকে। কারণ? রাজনৈতিক গোলযোগ নেই, যোগাযোগব্যবস্থা চমৎকার, কর খুবই অল্প, সরকারও আন্তরিক শিল্পপতিদের প্রতি, অবকাঠামো আর পরিবেশ তো অতুলনীয়। বর্তমানে গুগল, ফেসবুক, শেভরন, টয়োটা, পেপসিকোসহ এমন কোনো বৈশ্বিক কোম্পানি নেই, যারা সিঙ্গাপুরে আঞ্চলিক সদরদপ্তর খোলেনি।

লি এর সফলতার জাদুর কাঠি কি ছিলো?
লি একদিকে যেমন ছিলো বুদ্ধিদিপ্ত তেমনি ছিলো রাজনৈতিক ভাবে চৌকস। তাই তিনি, বুদ্ধিমতৃতার সাথে পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্র, চীনের সাথে সু সম্পর্ক রেখে এগিয়ে গিয়েছিলো। তাচাড়া, লি কুয়ান ব্রিটেনের ওয়েস্টমিনস্টার কায়দায় রাজনৈতিক ব্যবস্থা সাজিয়েছিলেন । কিন্তু কৌশলে আবার শক্তিশালী বিরোধী শিবিরের উত্থানের পথও রেখেছিলেন রুদ্ধ। ফলে ক্ষমতার সমার্থকই হয়ে গিয়েছিলো লি এর পিপলস অ্যাকশন পার্টি। রাষ্ট্র-ক্ষমতায় ধর্মীয় ও রাজনৈতিক সংখ্যালঘুদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে সচেষ্ট ছিলেন লি। ফলে বিদ্রোহের মুখেও কোনোকালে পড়তে হয়নি তাঁকে।

এ অভিজ্ঞতাগুলোই তিনি লিখে গেছেন ‘ওয়ান ম্যান্স ভিউ অব দ্য ওয়ার্ল্ড’ এর মতো অনবদ্য এক আত্মজীবনী তথা আত্মোপলব্ধিতে। জীবন সায়াহ্নের শেষ কয়টি দিন নিউমোনিয়ায় ভুগে ২০১৫ সালের ২৩ মার্চ ৯১ বছর বয়সে মারা যান লি কুয়ান ইউ।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে