রাতের আধারে “অপারেশন সার্চলাইট”

0
467

মাহিন, OURBANGLANEWS DESK।

পাকিস্তানের তৎকালীন সামরিক শাসক ছিলেন প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান। ইয়াহিয়া খান অনির্দিষ্টকালের জন্য পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত ঘোষণা করেন ১ মার্চ।

বাংলাদেশের মানুষ এই ঘোষণার বিরুদ্ধে রাস্তায় নামে স্বতঃস্ফূর্তভাবে। ১ মার্চ থেকে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে অসহযোগ আন্দোলন শুরু হয়।

২৫ মার্চ সন্ধ্যায় ইয়াহিয়া ঢাকা ত্যাগ করেন। এর আগে সে নিরস্ত্র বাংলাদেশের মানুষের ওপর লেলিয়ে দিয়ে যায় পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে।

মধ্যরাত থেকে ঢাকা শহরে অপারেশন সার্চলাইট নামে পূর্বনির্ধারিত গণহত্যার কর্মসূচি পরিচালনা করে শান্তিপ্রিয় জনগণের ওপর। নিরস্ত্র মানুষের ওপর আধুনিক অস্ত্রশস্ত্রে সুসজ্জিত পাকিস্তান সেনাবাহিনী ঝাঁপিয়ে পড়ে।

শুরু হয় এক ধ্বংসলীলার। এর মাধ্যমে প্রতীয়মান হয় যে, বাংলাদেশে সামরিক শক্তি বৃদ্ধির জন্য কালক্ষেপণ ও গণহত্যা পরিচালনার জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করাই ছিল তাদের একমাত্র লক্ষ্য।

ঢাকার রাস্তায় সেনাবাহিনী সেনা নামায় তিন ব্যাটালিয়ন। এক ব্যাটালিয়ন পদাতিক বাহিনী, এক ব্যাটালিয়ন বর্মাচ্ছাদিত এবং এক ব্যাটালিয়ন বিমান বিধ্বংসী অস্ত্রসজ্জিত।

ছাত্ররা ছিল তাদের প্রথম লক্ষ্য। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মধ্যরাতের দিকে আক্রমণ করে একদল সেনা এস-২৪ ট্যাংক নিয়ে। ইকবাল হলের অসংখ্য ছাত্র হঠাৎ আক্রমণে মৃত্যুবরণ করে।

সেনাবাহিনীর শিকার হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষক ও। অধ্যাপক ড. গোবিন্দ চন্দ্র দেব (দর্শন বিভাগ), অধ্যাপক মনিরুজ্জামান(পরিসংখ্যান বিভাগ), অধ্যাপক ড. জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা,

অধ্যাপক মুক্তাদির (ভূবিজ্ঞান বিভাগ), অধ্যাপক ফজলুর রহমান (মৃত্তিকাবিজ্ঞান বিভাগ), অধ্যাপক অনুদ্বৈপায়ন ভট্টাচার্য (ফলিত পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ), অধ্যাপক এ আর খান খাদিম (পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ) এবং শিক্ষক শরাফত আলী (গণিত বিভাগ) নিহত হন।

আক্রান্ত হয় জগন্নাথ হলও। গুলি করে হত্যা করা হয় সেখানে অবস্থানরত ছাত্রদের । তাঁদের কবর হলের সামনেই দেওয়া হয়।

নিহত শিক্ষক ও ছাত্রদের কবরে টেনে আনার কাজ এবং কবর খুঁড়তে লাগানো হয় হলের আট-নয়জন বেয়ারাকে। কাজ শেষ তাঁদের কবরের ধারে বসিয়ে চালায় গুলি।

রেললাইন বরাবর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে যে বস্তি ছিল, ধ্বংস করে দেওয়া হয় সেগুলো। সেনাবাহিনী বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা থেকে সরিয়ে ফেলে হত্যা করা বহু মানুষের লাশ। একসঙ্গে গর্ত করে মাটিচাপা দেওয়া হয় কিছু লাশ।

একই সঙ্গে সেনাবাহিনী আক্রমণ করে রাজারবাগ পুলিশ হেডকোয়ার্টার। সেখানে কিছু পুলিশ সদস্য আত্মরক্ষার জন্য যুদ্ধ করেন কয়েক ঘণ্টা। কিন্তু তাঁরা টিকে থাকতে পারেননি শেষ পর্যন্ত। এখানে নিহত হন অনেক পুলিশ সদস্য।

সেনাবাহিনী একইভাবে চারদিক থেকে আক্রমণ চালায় পিলখানায়, ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস বাহিনীর (ইপিআর) সদর দপ্তরে। সেখানে হত্যা করে শত শত বাঙালি ইপিআর সেনাকে।

ট্যাংক দিয়ে ইত্তেফাক পত্রিকা অফিসে আক্রমণ করা হয়। এখানে আশ্রয় নিয়েছিল অনেক মানুষ। সেনাবাহিনীর গোলাগুলিতে একেবারে ধ্বংস ও ভস্মীভূত হয়ে যায় পুরো বাড়িটি।

একেবারে ধ্বংস করে দেওয়া হয়, পরিবাগে ইংরেজি দ্য পিপল কার্যালয়। গুলিবর্ষণ করা হয় ঢাকা মেডিকেল কলেজেও।

সেনাবাহিনী সেখানে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেয় একটি বাজার। প্রতিটি স্থানে চারদিক থেকে ট্যাংক, মর্টার, মেশিনগান প্রভৃতি দিয়ে আক্রমণ করা হয়।

পুরান ঢাকায় সংঘটিত হয় সবচেয়ে ভয়ংকর হত্যাকাণ্ড। জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে বাড়িঘর মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হয়। ভস্মীভূত হয় তাঁতীবাজার ও শাঁখারীবাজার এলাকা।

পেট্রল ছড়িয়ে দেওয়া হয় বাড়িগুলোর ওপর। তার ওপরফ্লেম থ্রোয়ার ছুড়ে দেওয়া হয়। অসহায় নর–নারী, শিশু, বৃদ্ধারা যখন আগুন ও গোলা থেকে প্রাণ

বাঁচানোর জন্য বেরিয়ে আসছিল, তখন তাদের হত্যা করা হয় গুলি করে। এসব হিন্দু অধ্যুষিত এলাকা ছিল। প্রায় ৩০০ লোক হত্যা করা হয় রমনা কালীবাড়িতে।

১৫ থেকে ২০ জন যুবক হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলের সামনের রাস্তায় দাঁড়িয়ে খালি হাতে বিক্ষোভ প্রদর্শন করছিল। একটি মিলিটারি জিপ মেশিনগান নিয়ে হাজির হয় তাঁদের কাছে, গুলিবর্ষণ করে সোজা ঝাঁকের পর ঝাঁক।

কোনো দিনই জানা যাবে না ঢাকার কত লোককে প্রথম চোটে হত্যা করা হয়েছে তার সংখ্যা। এই মন্তব্যই করেছে টেলিগ্রাফসহ বিদেশি প্রতিটি পত্রিকা।

যে ধরনের আক্রমণ চালানো হয়েছে, লাখ লাখ লোকে ঠাসা ঢাকায়, তাতে সহজেই অনুমান করা চলে মানুষ মারা গেছে লাখের ওপর।

নিউইয়র্ক টাইমস ৩০ মার্চ বলেছে সেই কথাই। তাদের মতে, সমগ্র বাংলাদেশে তিন লাখ লোককে হত্যা করা হয়েছে কেবল ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে। এতে কোনো সন্দেহ নেই, এর অধিকাংশই ঢাকায়।

সেনাবাহিনী ঢাকার মতো নেমে পড়ে বাংলাদেশের অন্য শহরেও। সেনাবাহিনী ২৫ মার্চ চট্টগ্রামে বন্দর এলাকায় গুলি করে হত্যা করে বহু লোককে।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে