বাড়ি বাড়ি গিয়ে চিকিৎসাসেবা দিচ্ছে কেরানীগঞ্জ

0
206

বাড়ি বাড়ি গিয়ে চিকিৎসাসেবা দিচ্ছে কেরানীগঞ্জ

ইতিমধ্যে ঢাকার কেরানীগঞ্জ উপজেলার আক্রান্তের সংখ্যা ৩০০ ছাড়িয়েছে। একক উপজেলা হিসেবে এখানে সবচেয়ে বেশিসংখ্যক মানুষ করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। দেশে হাতেগোনা কয়েকটি জেলা ছাড়া বেশির ভাগ জেলায়ও এত বিপুলসংখ্যক রোগী শনাক্ত হয় নাই। করোনাভাইরাস সংক্রমণের কেন্দ্রস্থল নারায়ণগঞ্জের পাশের এই উপজেলায় সীমিত সম্পদ নিয়েই পরিস্থিতি মোকাবিলার চেষ্টা করছে কেরানীগঞ্জের স্বাস্থ্য বিভাগ। তারা এ ক্ষেত্রে জোর দিচ্ছে বাড়ি বাড়ি গিয়ে চিকিৎসা সেবায়। মোট আক্রান্তদের অর্ধেকের বেশি রোগীকে নিজ নিজ বাসায় রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।

উপজেলার জিনজিরা ছাটগাঁও এলাকার বাসিন্দা সুলতান মিয়া। তিনিসহ তাঁর পরিবারের তিনজন সদস্য করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। তাঁরা বাসায় থেকেই চিকিৎসা নিচ্ছেন। স্থানীয় স্বাস্থ্যকর্মীরা দুই এক দিন পরপর তাঁদের বাসায় যাচ্ছেন। পাশাপাশি চিকিৎসকেরা মুঠোফোনের মাধ্যমে নিয়মিত পরামর্শ দিচ্ছেন।

করোনা রোগীদের বাসায় রেখে সেবা দেওয়ার জন্য চিকিৎসকদের ৫ টি দলে এবং স্বাস্থ্য সহকারী ও সহকারী পরিদর্শকদের ১২ টি দলে ভাগ করে দেওয়া হয়েছে। এই দলগুলো নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে কাজ করছে। চিকিৎসকদের ৫ টি দলের মধ্যে ৩ টি দল আক্রান্ত রোগীদের নিয়ে কাজ করছে। প্রতিটি দলে ৩ জন করে চিকিৎসক আছেন। চিকিৎসকদের প্রতিটি দলের অধীনে ৪ টি করে মোট ১২ টি স্বাস্থ্য সহকারী ও সহকারী পরিদর্শকদের দল আছে। উপজেলার ১২ টি ইউনিয়নে এই ১২ টি দল কাজ করছে।

চিকিৎসকেরা ফোনের মাধ্যমে রোগীদের সাথে যোগাযোগের পাশাপাশি স্বাস্থ্য সহকারীদের মাধ্যমে খবরাখবর নেওয়া ও প্রয়োজনীয় ওষুধ দেওয়ার কাজ করছেন। প্রয়োজন হলে তাঁরা রোগীদের বাড়িতে যাচ্ছেন। আর স্বাস্থ্যকর্মীরা এক দিন পরপর রোগীদের বাড়ি যাচ্ছেন।

তাঁরা শরীরের তাপমাত্রা মাপার পাশাপাশি রোগীদের খোঁজখবর নিচ্ছেন এবং প্রয়োজনীয় ওষুধ ও পরামর্শ পৌঁছে দিচ্ছেন। এছাড়া দুইজন চিকিৎসকের একটি দল করোনা শনাক্তের পরীক্ষা নিয়ে কাজ করছে, আরেকটি দলে থাকা দুজন চিকিৎসক সুস্থ হয়ে ওঠার পর্যায়ে থাকা রোগীদের নিয়ে কাজ করছেন।

করোনায় আক্রান্ত কেরানীগঞ্জের বাসিন্দা সুলতান মিয়া বলেন, ‘চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা নিয়মিত যোগাযোগ রাখেন। দু-এক দিন পরপর বাসায় স্বাস্থ্যকর্মীরা দেখতে আসেন। তাঁরা প্রয়োজনীয় ওষুধপথ্য দিয়ে যান। এ ছাড়া এলাকার স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের লোকজন এসে বাসায় খাবার পৌঁছে দেন’।

কেরানীগঞ্জের উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটিতে ৩১ টি শয্যা আছে। এখানে ৬ টি আইসোলেশন (বিচ্ছিন্ন রাখা) শয্যা আছে। এ ছাড়া রয়েছে ২০ শয্যাবিশিষ্ট জিনজিরা হাসপাতাল। হাসপাতালটি কোভিড-১৯ রোগীদের চিকিৎসার জন্য নির্ধারণ করা হয়েছে। বর্তমানে এখানে ১৬ জন ভর্তি আছেন। জরুরি প্রয়োজন বিবেচনায় ৪ টি শয্যা ফাঁকা রাখা হয়েছে। এর বাইরে রাজধানীর কয়েকটি হাসপাতালে কেরানীগঞ্জের অনেকে চিকিৎসা নিচ্ছেন।

উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা মীর মোবারক হোসাইন বলেন, ‘ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জের সীমান্তবর্তী হওয়ায় কেরানীগঞ্জে আক্রান্ত বেশি হচ্ছে বলে তাঁরা মনে করছেন। আর শুরু থেকে পরীক্ষার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এখন রোগীর চাপ বেড়ে গেছে। দেড় শতাধিক রোগী চিকিৎসা নিচ্ছেন বাসায় থেকে। বাসায় স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের আলাদা আলাদা দল কাজ করে যাচ্ছে। চিকিৎসকেরা মূলত ফোনে সেবা দিচ্ছেন। স্বাস্থ্যকর্মীরা বাড়ি বাড়ি যাচ্ছেন। চিকিৎসার বাইরে খাবার বা অন্য কোনো সমস্যার কথা জানা গেলে তা উপজেলা প্রশাসনকে জানানো হয়। উপজেলা প্রশাসন সার্বিক সহায়তা দেয়’।

এ উপজেলায় শুরু থেকেই করোনাভাইরাসের সংক্রমণ শনাক্তের ওপর জোর দেওয়া হয়। শিক্ষক, কৃষি বিভাগের কর্মী এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের সমন্বয়ে দল গঠন করা হয়। তাঁরা গ্রামে গ্রামে গিয়ে সন্দেহভাজন রোগীদের তথ্য সংগ্রহ করেন। পরবর্তীতে দুইটি হটলাইন নম্বরও চালু করা হয়। রোগী শনাক্তের পর সংশ্লিষ্ট এলাকার স্থানীয় প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিরা মিলে লকডাউন (অবরুদ্ধ) করে দিতেন। তবে, উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা মীর মোবারক হোসাইন জানান, এখন রোগীর চাপ বেড়ে যাওয়ায় এই প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখা যাচ্ছে না।

এখন পর্যন্ত কেরানীগঞ্জের ১২ টি ইউনিয়নে করোনায় আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ৩০৭ জন। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ১০৪ জন আক্রান্ত হয়েছেন জিনজিরা ইউনিয়নে। এ ছাড়া তেঘরিয়া ইউনিয়নে ৬৩ জন, শুভাঢ্যা ইউনিয়নে ৫৫ জন আক্রান্ত হয়েছেন। আক্রান্তদের মধ্যে ৩ জন চিকিৎসক, ২২ জন স্বাস্থ্যকর্মী, ৪১ জন পুলিশ সদস্য, ২০ জন র্যাব সদস্যও আছেন।

জিনজিরা ইউনিয়নে দায়িত্বরত স্বাস্থ্যকর্মী দলের প্রধান সহকারী স্বাস্থ্য পরিদর্শক (এএইচআই) সালমা জাসমিন। তাঁর দলে আরও তিনজন সহকারী পরিদর্শক কাজ করছেন। সালমা জাসমিন বলেন, ‘তাঁরা প্রতিদিন নিয়ম করে রোগীদের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করেন। এক দিন পরপর সশরীরে রোগীদের বাড়ি বাড়ি যান, প্রয়োজনীয় ওষুধ ও পরামর্শ দেন’।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে