করোনা: সংক্রমণের ইতিবৃত্ত

0
645
ছবি : সংগ্রহীত

করোনা: সংক্রমণের ইতিবৃত্ত

বিশ্ব যতই উন্নত হচ্ছে না কেন মহামারীর কবল থেকে কিন্তু কোন জাতিই রক্ষা পাচ্ছে না। একবিংশ শতাব্দীতে এ পর্যন্ত মানবজাতি তিনবার করনাভাইরাসের তিনটি পৃথক পৃথক প্রজাতির মাধ্যমে আক্রান্ত হয়েছে।

২০০২ সালের নভেম্বর মাসে চীনের গুয়াংডং রাজ্যে উৎপত্তি যেটা পরবতীতে বিশ্বব্যাপী মহামারী আকারে ছড়িয়ে পরেছিল এবং পশুপাখির( বাদুড়,আফ্রিকান সিভেট ক্যাট) মধ্যে সংক্রমিত হয়েছিল যা কিনা জানুয়ারী ২০০৪ পর্যন্ত বিদ্যমান ছিল।

তৎকালীন সময় পৃথিবীর ২৯টি দেশে করোনার প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছিল। SARS- COV1 এ সর্বমোট আক্রান্ত হয়েছিল ৪০৯৬ জন যার মধ্যে মৃত্যুবরণ করেছিল ৭৭৪ জন এবং এর মৃত্যুহার ছিল ৯.৬% । SARS- COV1 এর সংক্রমণের প্রায় ১০ বছর পর ২০১২ সালে মধ্যপ্রাচ্যে করোনা ভাইরাস (MERS) এর সংক্রমণ ঘটে যা “ক্যামেল ফ্লু” নামে পরিচিত। দুর্ভাগ্যবশত MERS ভাইরাস এখন অব্দী মধ্যপ্রাচ্যের সৌদী আরবে সংক্রামণ ঘটিয়ে যাচ্ছে। ২০২০ সালের সর্বশেষ রিপোর্ট অনুযায়ী মৃত্যুর সংখ্যা ৪৬৬ জন।

২০১৫ সালে দক্ষিণ কোরিয়ায় মধ্যপ্রাচ্য থেকে ভ্রমন করে আসা মানুষের মাধ্যমে সংক্রমণ দেখা দিয়েছিল। বলাবাহুল্য এটির কোন প্রতিষেধক এখনো আবিষ্কার হয় নি।এখন একবিংশ শতাব্দীর সবেথকে ভয়াবহ সময় পাড় করছে সমগ্র পৃথিবী। নভেল করোনা ভাইরাস (SARS-COV2) এর কবলে বিশ্বের ২০৯ টি দেশ। বিগত ১০০ দিনের মধ্যেই বিশ্বজুড়ে ১০ লাখের বেশি সংক্রমণ হয়েছে
অন্যান্য করোনা ভাইরাসের মতো COVID 19 শ্বাসতন্ত্রের জটিলতা সৃষ্টি করে ।নিউমোনিয়া হচ্ছে এর সাধারণ উপসর্গ। শীতকালে এই ধরণের ভাইরাস তুলনামূলক বেশি বিস্তার করে কিন্তু COVID 19 বিস্তারের অত্যানুকুল তাপমাত্রা নিয়ে এখনও গবেষণা চলছে। যেহেতু এখন পর্যন্ত কোন ভ্যাকসিন আবিস্কার হয় নাই এবং ভাইরাল সংক্রামক হওয়ার দরুন কোন এন্টিবায়োটিক এটির বিরুদ্ধে কার্যকর নয় তাই প্রতিরোধই একমাত্র উপায়। পরিস্কার পরিচ্ছন্ন থাকা এবং সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখাই এই মহামারী থেকে আমাদেরকে রক্ষা করবে। করোনা ভাইরাস নিয়ে কিছু মতান্তর রয়েছে যেটা কিনা এটার সংক্রামক বাড়িয়ে দিতে পারে।

• শুধু বয়স্ক মানুষ করোনায় আক্রান্ত হয়ঃ বয়স্ক মানুষের দেহে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকে তাই তাদের মৃত্যুহার বেশি।কিন্ত দিন যত বাড়ছে সব বয়সী মানুষের আক্রান্ত হওয়ার প্রবণতা দেখা দিচ্ছে।
• তাপমাত্রাঃ তাপমাত্রা বাড়লে করোনা কমবে বলে বিশ্বাস করা হচ্ছে। যেটা নিশ্চিত না, গবেষণা চলছে।তাই যতদিন সরকার লকডাউন জারি রাখে সেটা অনুসরণ করাই শ্রেয়।

• ইনকিউবেশন সময়ঃ করোনার ইনকিউবেশন সময় পরিবর্তন হচ্ছে। উহানের ১৪১ টি কেসের ক্ষেত্রে দেখা গিয়েছিল এর ইনকিউবেশন পিরিয়ড ৫ দিন কিন্তু এখন লক্ষ করা হচ্ছে এটা ২৪ দিন পর্যন্ত সময় নেয় রোগের লক্ষন প্রকাশ করতে এবং এটা মানবদেহে ৩৭ দিন পর্যন্ত থাকতে পারে।
• করোনা পজিটভ টেস্টঃ করোনা জামাকাপড় ও অন্যান্য কঠিন পৃষ্ঠে দীর্ঘসময় জীবিত থাকতে পারে । তাই কেউ যদি করোনা নেগেটিভ হয় তার মানে এই নয় যে সে খুব শীঘ্রই আক্রান্ত হবে না।
• দুরত্বঃ একবার হাঁচির সময় ৩০০০ কনিকা নির্গত হয়।একজন ব্যাক্তি অন্য একজনের থেকে কতদূর থাকবে তা নিয়ে একটা মতান্তর রয়েছে। ৩ ফুট দূরত্ব পর্যন্ত ছড়াতে পারে আবার কেউ বলছে ৬ ফুট। কিন্ত দূরত্ব যেটাই হোক মাস্ক ব্যবহারের কোন বিকল্প নেই।

মানবদেহের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাঃ

আমাদের শরীরে বিভিন্ন ব্যাকটেরিয়া এবং ভাইরাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য রোগপ্রতিরোধকারী কোষ রয়েছে যা করোনাভাইরাস এর বিরুদ্ধে অ্যান্টিবডি তৈরি করতে সক্ষম।অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় যে ১৪-২৫ দিনের মধ্যে রোগের উপসর্গ ছাড়াই সুস্থ হয়ে যাচ্ছে, তবে কোন ব্যক্তির যদি ডায়েবেটিক, উচ্চরক্তচাপ, হ্রদরোগ,হাপানি সহ ফুসফুসের অন্য কোন রোগের উপসর্গ থাকে তবে তার করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হবার ঝুকি থাকে অনেক বেশি এবং তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাও অনেক কম থাকে ।
ভাক্সিন
ভাক্সিন তৈরির বিরুদ্ধে সবথেকে বড় বাধা হচ্ছে ভাইরাস এর জিনগত পরিবর্তন। যে কারনে এখন পর্যন্ত ইনফ্লয়েঞ্জা , সারস, মারস এর বিরুদ্ধে ভাকসিন তৈরী করা সম্ভব হয়নি। Fred Hutchinson Cancer Reaserch Center এর গবেষক Trevor Bedford জানান COVID 19 এর জীনগত পরিবর্তন হচ্ছে কিন্ত সেটা খুব মুখ্য না।তাই গবেষকগন প্রতিষেধক আবিস্কারের ব্যাপারে আশাবাদী।

COVID 19 থেকে যা শিক্ষণীয়ঃ

ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিলে হয়ত আমরা আজ এই মহামারীর সম্মুখীন হতাম না। উৎপত্তিস্থল থেকে যদি কোন COVID 19 রোগাক্রান্ত বহনকারী অন্যকোন দেশে ভ্রমণ না করত তবে বিশ্বকে আজ এভাবে করোনার কাছে হার মানতে হত না
আমাদের করণীয়
• জনসচেতনতা বৃদ্ধি করা বিশেষকরে সুবিধাবঞ্চিত মানুষের মাঝে যাদের জ্ঞান সীমিত।
• পরিস্কার পরিচ্ছন্ন থাকার প্রতি গুরুত্ব আরোপ করা বিশেষ করে বার বার সাবান দিয়ে হাত ধোয়া।
• আমাদের শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করা।
• নিয়মিত ব্যায়াম করা
• ধূমপান বন্ধ করা
• ভিটামিন সি এবং অন্যান্য পুস্টিকর খাবার গ্রহণ করা।
• সর্বপরী বিশ্ব স্বাস্থ্যসংস্থা প্রণদিত COVID 19 এর বিরুদ্ধে নেওয়া নীতিমালা অনুসরণ করা।

ইফরা তুন নূর
সিনিয়র লেকচারার
অণুজীববিজ্ঞান বিভাগ
স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ ।

 

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে