ইন্দোনেশিয়াকে টপকে চাল উৎপাদনে তৃতীয় স্থানে বাংলাদেশ

0
268

ইন্দোনেশিয়াকে টপকে চাল উৎপাদনে তৃতীয় স্থানে বাংলাদেশ

করোনার প্রাদুর্ভাবে দেশের মানুষ যখন আতঙ্কিত, দুশ্চিন্তাগ্রস্ত তখন সুসংবাদ নিয়ে এসেছে মার্কিন কৃষি বিভাগ (ইউএসডিএ)। কৃষি বিভাগের পূর্বাভাস বলছে, চলতি অর্থবছরে (২০১৯-২০) চাল উৎপাদন ৩ কোটি ৬০ লাখ টন ছাড়িয়ে যাবে।

আর এর ফলে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় চাল উৎপাদনকারী দেশের তালিকায় তৃতীয় স্থানে পৌঁছে যাচ্ছে বাংলাদেশ। এর মাধ্যমে ইন্দোনেশিয়াকে টপকে যাবে বাংলাদেশ। অর্থনীতিবিদ ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই স্থান ধরে রাখতে হলে উৎপাদন আরও বাড়াতে হবে। পাশাপাশি আধুনিক ও বিজ্ঞানভিত্তিক চাষাবাদ ব্যবস্থায় যেতে হবে। কৃষককে উন্নত উপকরণ দিয়ে সাহায্য করতে হবে।

দেশের স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ের তুলনায় দেশের চাল উৎপাদন বেড়েছে প্রায় তিনগুণ। দীর্ঘদিন ধরে এই খাদ্যশস্য উৎপাদনে বাংলাদেশের বৈশ্বিক অবস্থান ছিল চতুর্থ। চীন ও ভারতের পরে তৃতীয় স্থানে ছিল ইন্দোনেশিয়া। তবে এবার ইন্দোনেশিয়াকে টপকে উঠে এসেছে বাংলাদেশ। চলতি অর্থবছরে আমন মৌসুমে রেকর্ড পরিমাণ ধান উৎপাদন হয়েছে। আবার গত আউশ মৌসুমের চালের উৎপাদনও বৃদ্ধি পেয়েছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, তিন মৌসুমে উৎপাদন বৃদ্ধির সম্মিলিত ফলাফলই বাংলাদেশকে শীর্ষ তিনে নিয়ে এসেছে।

পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের সদস্য, সিনিয়র সচিব ও কৃষি অর্থনীতি সমিতির সাবেক সভাপতি অধ্যাপক ড. শামসুল আলম চাল উৎপাদনে বিশ্বে তৃতীয় স্থান অধিকারের বিষয়ে বলেন, ‘এটা আমাদের জন্য অত্যন্ত সুখরব। দেশে চালের উৎপাদন প্রতিনিয়ত বাড়ছে। তার পরেও আমাদের জনসংখ্যার চাপ এত বেশি যে এখনো আমরা চাল আমদানিকারক দেশ। প্রতি বছর ৫০-৫৫ লাখ মেট্রিকটন চাল আমাদের আমদানি করতে হয়। চাল উৎপাদন আরও বেশি বাড়িয়ে এটা ধরে রাখতে হবে। আমাদের অনেক দূর যেতে হবে। আমাদেরকে সম্পূর্ণভাবে চাল রফতানিকারক দেশ হিসেবে পরিণত হতে হবে’।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘যে জমি আছে সে জমি দিয়েই আরও অধিক ফসল ফলানো সম্ভব। এ জন্য আমাদেরকে আধুনিক ও বিজ্ঞানভিত্তিক চাষাবাদে যেতে হবে। কৃষককে প্রশিক্ষণ দিতে হবে’।

কৃষি সচিব মো. নাসিরুজ্জামান বলেন, ‘এ কৃতিত্ব কৃষকের। এ ছাড়া আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং কৃষিমন্ত্রীও কৃতিত্বের অধিকারি। কারণ ডিএপি সারের দাম কমানো হয়েছে বলে এর সুফল পেলাম। দাম কমানোর ফলে কৃষক ভালোভাবে বোরো ফসলে সার ব্যবহার করতে পেরেছেন’।

তিনি বলেন, ‘ইন্দোনেশিয়াকে টপকে বিশ্বের তৃতীয় শীর্ষ চাল উৎপাদনকারী হতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। এর মধ্যে দিয়ে আমরা খাদ্য নিরাপত্তায় এক ধাপ এগিয়ে গেলাম। এ কৃতিত্ব ধরে রাখতে হবে। আগামীতে ফলন আরও বাড়াতে হবে। এজন্য প্রযুক্তি কৃষকের দোরগোড়ায় পৌঁছাতে হবে। তাহলে আমরা এ স্থানটি ধরে রাখতে পারবো’।

ইউএসডিএর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৯-২০ অর্থবছরে সারাবিশ্বে চালের উৎপাদন ৫০ কোটি ২০ লাখ টন ছাড়াতে পারে, যা গত অর্থবছরের চেয়ে প্রায় দুই শতাংশ বেশি। এ অর্থবছরেও সবচেয়ে বেশি চাল উৎপাদন করবে চীন। চলতি অর্থবছরে ১৪ কোটি ৯০ লাখ টন চাল উৎপাদন করবে দেশটি। এরপরে রয়েছে ভারত। এদেশের মোট চাল উৎপাদন দাঁড়াবে ১১ কোটি ৮০ লাখ টন। এর পর ৩ কোটি ৬০ লাখ টন চাল উৎপাদন করে তৃতীয় অবস্থানে উঠে আসছে বাংলাদেশ। আর দীর্ঘদিন ধরে তৃতীয় স্থানে থাকা ইন্দোনেশিয়া নেমে আসবে চতুর্থ অবস্থানে। এ অর্থবছরে দেশটির চাল উৎপাদন হবে ৩ কোটি ৪৯ লাখ টন।

বাংলাদেশের উৎপাদিত চালের ৫৫ শতাংশের বেশি আসে বোরো ধান থেকে। বাকিটা আসে আউশ ও আমন ধান থেকে। দেশের জমিগুলোতে বছরে একই জমিতে তিনবার ধান উৎপাদন করা হয়। ধান চাষের আওতায় আনা হচ্ছে বিস্তীর্ণ হাওর এলাকা। এ অঞ্চলের উপযোগী ধানের জাত সম্প্রসারণের মাধ্যমে উৎপাদন বাড়ানো হচ্ছে। চলতি মৌসুমে হাওর এলাকায় ধানের বাম্পার ফলনের মাধ্যমে দেশের চাল উৎপাদনে বড় পরিবর্তন আসতে পারে।

ইউএসডিএর তথ্য অনুযায়ী, এ অর্থ বছরে চাল উৎপাদনে শীর্ষ ১২ টি দেশের মধ্যে ইন্দোনেশিয়ার পর থাকছে ভিয়েতনাম। দেশটিতে এবার উৎপাদন হবে দুই কোটি ৭৫ লাখ টন। এরপর থাইল্যান্ডে দুই কোটি ৪ লাখ টন, মিয়ানমারে এক কোটি ৩১ লাখ টন, ফিলিপাইনে এক কোটি ১০ লাখ টন, জাপানে ৭৬ লাখ ৫০ হাজার টন, পাকিস্তানে ৭৫ লাখ টন, ব্রাজিলে ৬৯ লাখ ও কম্বোডিয়ার প্রায় ৫৮ লাখ টন চাল উৎপাদন হবে।

চলতি বছরে খারাপ পরিস্থিতির কারণে ইন্দোনেশিয়া চাল উৎপাদনে শীর্ষস্থান ধরে রাখতে পারেনি। তবে সামনের বছর দেশটি ঘুরে দাঁড়াতে পারে। তখন বাংলাদেশের জন্য তৃতীয় স্থান ধরে রাখা চ্যালেঞ্জিং হবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক কৃষিবিদ ড. মো. শাহজাহান কবীর বলেন, ‘এটা জাতির জন্য অনেক বড় অর্জন। দেশে যে খাদ্য উৎপাদন বাড়ছে এটা তারই প্রমাণ। খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধির ধারাবাহিকতার কারণেই আমরা পঞ্চম থেকে চতুর্থ এবং চতৃর্থ থেকে আজ তৃতীয় স্থানে অবস্থান নিতে যাচ্ছি। ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক হিসেবে আনন্দে আমার বুকটা ভরে গেছে। এটা খুবই বড় অর্জন’।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘ইন্দোনেশিয়া অনেক বড় দেশ। তাদেরকে পেছনে ফেলাটা একটা বড় বিষয়। এই স্থানটা ধরে রাখাও বড় চ্যালেঞ্জ। আমরা ‘রাইস ভিশন ২০৫০’ প্রণয়ন করেছি এবং সে টার্গেট অনুযায়ী এগিয়ে যাচ্ছি। বাংলাদেশে আর কখনো খাদ্য সংকট হবে না, দুর্ভিক্ষ হবে না’।

কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক কৃষিবিদ ড. আবুল কালাম আযাদ বলেন, ‘বাংলাদেশকে এক সময় তলাবিহীন ঝুড়ি বলা হতো। সেখান থেকে আজ খাদ্যে উদ্বৃত্ত দেশ। এটা অভাবনীয় সাফল্য। এই সাফেল্যের পেছনে ম্যাজিক্যাল কিছু নেই। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ও কৃষি মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী এবং সকল কৃষি বিভাগের কর্ম পরিকল্পনা, কৃষকদেরকে কৃষি উপকরণের যোগান দেয়াটা ভালো কাজ হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেছেন।

যেমন বোরোর আগে সারের দাম কমানোটা অত্যন্তু যুক্তিযুক্ত হয়েছে। এ ছাড়া কৃষকদের বিভিন্ন টেকনোলজিক্যাল সাপোর্ট ও পরিকল্পনা ধান প্রডাকশনকে এগিয়ে নিয়েছে। কৃষির ক্ষেত্রে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যে নীতি গ্রহণ করেছিলেন তার কন্যা শেখ হাসিনা সেই নীতি অনুসরণ করেছেন। সে কারণেই এ সাফল্য’।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে