আজ শুক্রবার ২৯ মার্চ, ৬৮তম জন্মবার্ষিকী অকুতোভয় বীর মুক্তিযোদ্ধা শাফী ইসলাম রুমীর।

0
422

OURBANGLANEWS DESK।

‘ক্র্যাক প্লাটুন’ ছিলো বাংলার গেরিলা যুদ্ধের পথিকৃৎ। উজ্জ্বলতম নক্ষত্রের নাম স্বাধীন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে।

সদ্য আই.এস.সি পাশ করা রুমী ছিলেন এই গেরিলা দলেরই অন্যতম সদস্য। তাঁর বয়স তখন মাত্র বিশ।

২৯ মার্চ সাল ১৯৫১। এক ফুটফুটে পুত্র সন্তান শরীফ ও জাহানারা ইমামের ঘর আলো করে আসে। মা জাহানারা ইমাম কবি জালালুদ্দীন রুমীর মতো জ্ঞানী ও দার্শনিক হবে ভেবে, ছেলের নাম রাখেন রুমী।

১৯৭১ সালে আই.এস.সি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে ভর্তি হন মার্চ মাসে। পাশাপাশি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিশেষ অনুমতিতে ক্লাস করতেন এর অর্থনীতি বিভাগে। তুখোড় তার্কিক ছিলেন।

স্টার মার্কস নিয়ে ১৯৬৮ সালে মাধ্যমিক পাস করেন বিজ্ঞান বিভাগ থেকে। প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় ১৯৭০ সালের ডিসেম্বরে ভর্তি হন।

ক্লাস আরম্ভ হতে দেরি হওয়ায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি বিভাগে শুরু করেন ক্লাস বিভাগীয় প্রধানের অনুমতি নিয়ে।

পাশাপাশি ভর্তি হন আমেরিকার ইলিনয় স্টেটের শিকাগো শহরে ইলিনয় ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজিতে। ১৯৭১ সালের সেপ্টেম্বর মাসে শুরু হওয়ার কথা ক্লাস।

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ মধ্যরাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ঝাঁপিয়ে পড়ে নিরস্ত্র বাঙালির ওপর। হত্যাযজ্ঞ চালায়।

শুরু হয়ে গেছে মুক্তিকামীদের মুক্তির জন্য যুদ্ধ! যুদ্ধের মধ্যে দেশকে রেখে নিরাপদ আশ্রয়ে বিদেশে চলে যাবেন? সায় দেয় নি তার বিবেক।

তাই তোয়াক্কা করেননি সেখানে পড়ার সুযোগকে, যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন দেশমাতৃকার ডাকে, শত্রু হননে!

রাজি ছিলেন না মা-বাবা। শেষমেশ রুমী ১৯৭১ সালের ১৯ এপ্রিল মাকে রাজি করিয়েই ২ মে সীমান্ত অতিক্রমের প্রথম প্রয়াস চালান।

কিন্তু তাঁকে ফিরে আসতে হয় প্রতিকূল পরিস্থিতির কারণে। এরপর দ্বিতীয় প্রচেষ্টা চালান। হন সফল। সেক্টর-২ এর অধীনে প্রশিক্ষণ নেন মেলাঘরে যুদ্ধের জন্য।

খালেদ মোশাররফ ও রশিদ হায়দার দায়িত্বে ছিলেন এই সেক্টরটির পরিচালনার। ঢাকায় ফেরেন প্রশিক্ষণ শেষে। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে যোগ দেন ক্র্যাক প্লাটুনে গেরিলা আক্রমণ পরিচালনাকারী সংগঠনে।

সিদ্ধিরগঞ্জ পাওয়ার স্টেশন হামলা করার উদ্দেশ্য। তাকে সে সময় পরিচালনা করতে হয় বেশ কটি ঝুঁকিপূর্ণ আক্রমণ।

এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল ধানমণ্ডি রোডের একটি আক্রমণ। সেখানে তাদের বহনকারী গাড়ির পিছু নেন একটি পাকিস্তানী সেনা জিপ, তিনি করেন স্টেন গান ব্রাশফায়ার।

পাকিস্তানি জিপের ড্রাইভার নিহত হয় তার গুলিতে, ল্যাম্পপোস্টে ধাক্কা খায় গাড়ি। এরপর তার গুলিতে মারা যায় বেশ কয়েকজন পাকিস্তানি সেনা।

২৯ আগস্ট ১৯৭১ সাল।

তাঁর নিজের বাড়িতে আগের দিন তিনি ফিরে এসেছিলেন। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী গভীর রাতে ধরে নিয়ে যায় বাবা, ভাই, বন্ধু, চাচাতো ভাইসহ রুমীকে।

ক্রাক প্লাটুনের দুর্ধর্ষ মুক্তিযোদ্ধা বদিউল আলম, মাসুদ সাদেক চুল্লু, আলতাফ মাহমুদ এবং তাঁর চার শ্যালক, আবুল বারক আলভী, আজাদ জুয়েল, বাশারসহ অনেকে ধরা পড়েন।

রুমীকে নেয়া হয় এমপি হোস্টেলে টর্চার সেলে। নেওয়ার পর তিনি তাঁর বাবা, ভাইকে বলেছিলেন, ‘তোমরা কেউ কিছু স্বীকার করবে না।

তোমরা কেউ কিছু জান না। আমি তোমাদের কিছু বলিনি’। রুমীর কাছ থেকে একটি তথ্যও বের করা যায়নি ভয়ংকর অত্যাচারেও।

৩০ আগস্টের পর আর কখনও দেখা যায়নি রুমী ও তার সহযোদ্ধা বদীকে।

১৯৭১-এর ২৯ মার্চ, জন্মদিন রুমির। জাহানারা ইমাম ও শরীফ ইমাম রুমির জন্মদিনের আশীর্বাদ লিখেছিলেন, “বজ্রের মত হও, দীপ্ত শক্তিতে জেগে ওঠ, দেশের অপমান দূর কর, দেশবাসীকে তার যোগ্য সম্মানের আসনে বসাবার দুরূহ ব্রতে জীবন উৎসর্গ করো”।

কথা রেখেছেন শহীদ শাফী ইমাম রুমী, করে গেছেন তা-ই।

রুমীর বাবা, ভাই, বন্ধু, চাচাতো ভাইকে পাকিস্তানি জান্তুরা ছেড়ে দিলেও ছাড়ে না রুমীকে। পাকিস্তানি বাহিনীর কাছে ছিল রুমীদের গেরিলা অপারেশনের সব খবরই।

রুমী শুধু স্বীকার করেন ২৫ আগস্ট রাতের অপারেশনের কথা। তাঁর ওপর চলে ভয়ংকর অত্যাচার। কিন্তু ওরা আর কারও নাম জানতে পারেনি তাঁর কাছ থেকে।

মা-বাবা ছেলের মাথা সমুন্নত রাখতে সরকারের কাছে রুমীর প্রাণ ভিক্ষার জন্য করেননি আবেদনও।

প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া ৫ সেপ্টেম্বর ঘোষণা করেন সাধারণ ক্ষমা। কিন্তু সেটা পছন্দ ছিল না পাকিস্তানি সরকারি কর্মকর্তাদের অনেকেরই।

তাই শ খানেক বন্দীকে তাড়াহুড়ো করে গুলি করে মেরে ফেলা হয় ৪ সেপ্টেম্বর। ধারণা করা হয়, রুমী শহীদ হন সেই ৪ সেপ্টেম্বর।

আজ আবার ফিরে এসেছে সেই ২৯ মার্চ। আজ ৬৮তম জন্মবার্ষিকী সেই অকুতোভয় বীর মুক্তিযোদ্ধা শাফী ইসলাম রুমীর।

২৯ মার্চ বছর ঘুরে ফিরে ফিরে আসবে এভাবেই, কিন্তু ফিরবেন না রুমী। আর বয়সও বাড়বে না তাঁর। তিনি কুড়ি বছরের তরুণ হয়ে থেকে যাবেন স্বাধীনতার শতসহস্র বছর পরেও!

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে